প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস

স্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির মাঝে কিছু ঝুঁকি দেখছে আইএমএফ

বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা দ্রুত বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি কমে আসবে; ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা দ্রুত বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি কমে আসবে; ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। অবশ্য সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। যাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় পর্যায়ে কর হ্রাস, বিদেশী পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ, ব্যবসায়িক নীতি শিথিলীকরণ ও অবৈধ অভিবাসী বহিষ্কারের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত। খবর এপি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক বহুজাতিক ঋণদাতা সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছর ও ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে সম্প্রসারণ হবে। অর্থাৎ গত বছরের ৩ দশমিক ২ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি।

এ পূর্বাভাস অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্দেশ করলেও বৃহত্তর পরিসরে প্রবৃদ্ধির এ হার আকর্ষণীয় নয়। কারণ ২০০০-১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে প্রতি বছর ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে সম্প্রসারণ হয়েছিল। আইএমএফের মতে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিঘাতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে প্রতিফলিত করে ধীর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস। এর মধ্যে রয়েছে কভিড-১৯ মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ।

কার্যক্রমের দিক থেকে বিশ্বের ১৯১টি দেশের সঙ্গে যুক্ত আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নত করতে এবং বৈশ্বিক দারিদ্র্য হ্রাসে কাজ করে।

কভিড-১৯ মহামারীর কারণে ধারাবাহিকভাবে বিঘ্ন ঘটেছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেশির ভাগ দেশই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছর মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে আসবে। ২০২৪ সালের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে এ বছর ৪ দশমিক ২ এবং ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে কমে আসবে। তবে আইএমএফের পূর্বাভাসের সঙ্গে এক ব্লগ পোস্টে সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ার গৌরিঞ্চাস মূল্যস্ফীতি বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি লেখেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পিত নীতিগুলো স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ট্রাম্প বড় ধরনের করছাড় বাস্তবায়ন করলে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। একইভাবে বিদেশী পণ্যে বড় শুল্ক আরোপ সাময়িকভাবে হলেও দাম বাড়াবে এবং সারা বিশ্বের রফতানিকারকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অভিবাসনের ক্ষেত্রে কড়া পদক্ষেপ নিলে রেস্তোরাঁ, নির্মাণ এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে, যা কোম্পানিগুলোর ব্যয় বাড়াবে এবং প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলবে।

পিয়ের-অলিভিয়ার গৌরিঞ্চাস আরো লিখেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যবসায়িক নীতি শিথিল করার পরিকল্পনা নিয়মকানুনের জটিলতা হ্রাস ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। তবে এ বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন যে অতিরিক্ত নীতি শিথিলতা আর্থিক সুরক্ষাকে দুর্বল এবং আর্থিক দুর্বলতাগুলো বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে একটি বিপজ্জনক চড়াই-উতরাইয়ের পথে নিয়ে যেতে পারে।

২০২৪ সালে মার্কিন অর্থনীতি বিভিন্ন ধরনের আশঙ্কা হটিয়ে শক্তিশালী হয়েছে। এর সুফল পাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্পও। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৫ সালে মার্কিন অর্থনীতি ২ দশমিক ৭ শতাংশ সম্প্রসারণ হবে, যা গত অক্টোবরে দেয়া পূর্বাভাস ২ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় আধা শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

শ্রমবাজারে দৃঢ় অবস্থা নিয়ে ২০২৪ সাল শেষ করে মার্কিন অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় ফেডারেল রিজার্ভ উচ্চ সুদহার নির্ধারণ করলেও শক্তিশালী কর্মসংস্থান বাজারের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে দেশটি যা ভোক্তা আস্থা ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতায় শক্তিশালী গতি ও অভিবাসীপ্রবাহ কর্মী সংকট দূরীকরণে সাহায্য করেছে।

আইএমএফের প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী পারফরম্যান্সের বিপরীতে আটলান্টিকের ওপারের উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধিতে তীব্র বৈসাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে। ইউরো মুদ্রাভুক্ত ২০টি দেশ ২০২৫ সালে সম্মিলিতভাবে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, যা ২০২৪ সালের দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কিছুটা বেশি হলেও গত অক্টোবরের ১ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের তুলনায় কম।

আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদের মতে, এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে দুর্বল উৎপাদন কার্যক্রম, ভোক্তা আস্থাহীনতা ও জ্বালানি সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব।

সম্প্রতি চীন জানিয়েছে, তারা গত বছর ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। তবে আইএমএফের মতে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতি ২০২৪ সালের ৪ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, যা ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। চীনের আবাসন বাজারের পতন গ্রাহক আস্থাকে দুর্বল করেছে। সরকার সুদহার হ্রাস, ব্যয় বৃদ্ধি বা করহ্রাসের মতো পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নিলে চীন ঋণ সংকোচন স্থবিরতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে গৌরিঞ্চাস সতর্ক করেছেন। এতে মূল্য সংকোচন ভোক্তা ব্যয়ে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং ঋণ পরিশোধ আরো ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।

সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের একদিন পরই আইএমএফের এ পূর্বাভাস প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জন্য ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও একই ছিল।

আরও